উচ্চ আদালতের রায় মানছে না সরকার

Published 07/07/2012 by idealcollect

ওয়াকিল আহমেদ হিরন/আবু সালেহ রনি
উচ্চ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে উপেক্ষিত থাকছে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট রায়। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও রায় বাস্তবায়নে এক শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার গাফিলতি ঘটছে অহরহ। এ সুযোগে কিছুসংখ্যক ভূমিদস্যু, পরিবেশ বিপন্নকারীসহ স্বার্থান্ধ কিছু লোক হয়ে উঠছে বেপরোয়া। থামছে না পাহাড় কাটা, সমুদ্রসৈকত, নদী ও ফুটপাত দখল, খাদ্যে ভেজালের মতো অপরাধ। আইন প্রয়োগ করাই যাদের কাজ, তারাও যেন নির্বিকার। রাষ্ট্রের নানা সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জনস্বার্থ বিষয়ক এসব রায় উপেক্ষা করছেন। সংবিধানের ১১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের রায় বা আদেশ কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত সকল নির্বাহী ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টকে সহায়তা করবে।’ সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতি সীমাহীন অবস্থায় পেঁৗছার কারণে তারা উচ্চ আদালতের রুলের জবাবও সময়মতো দিচ্ছেন না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের রায় বা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ
বাস্তবায়ন সরকারের সংশ্লিষ্টদের জন্য সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকারকেই রায় বাস্তবায়নে সঠিক ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতের রায় অবশ্যই বাস্তবায়ন করা উচিত। রায় অমান্য করা আদালত অবমাননার শামিল। যেসব মন্ত্রণালয় বা বিভাগ রায় বাস্তবায়ন করছে না, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হবে। যে রায় বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেটা অবশ্যই দ্রুততম সময়ে করতে হবে। যেসব রায় বাস্তবায়নে সময়ের প্রয়োজন, সেটাও আদালতকে অবহিত করতে হবে।
আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সমকালকে বলেন, আদালতের রায় বা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাস্তবায়ন করা সরকারের সংশ্লিষ্টদের জন্য সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এটা অস্বীকার করা হলে আইনের শাসন বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমান সমকালকে বলেন, দেশের প্রশাসনিক কাঠামোগুলো জনগণের কাঙ্ক্ষিত মান অনুসারে সঠিক পুনর্বিন্যাস হয়নি। এর ফলে উচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা আদালতের আদেশও অগ্রাহ্য করছেন। তার মতে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট রায় বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন জরুরি। এ জন্য একটি পর্যবেক্ষণ সেলও করা যেতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার একেএম শামসুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আদালতের নির্দেশ বা রায় বাস্তবায়ন হচ্ছে কি-না, তা ফলোআপ করতে হাইকোর্টের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা নেই। রিটকারী বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্দেশ মানা হচ্ছে না বলে আদালতকে অবহিত করলে আদালত সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। এ জন্য বিবাদীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা হবে।
মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি এবং একাধিক জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার রিটকারী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার কারণে আদালতের রায় বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ ছাড়া রাজনৈতিক চাপ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও রয়েছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলা থেকে জনগণ উপকৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলেও সেগুলোকে বিভিন্ন কৌশলে স্বার্থান্বেষী মহল বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী চার নদী (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা) সংলগ্ন অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর ও সব যান্ত্রিক পরিবহনে গতিনিয়ন্ত্রক যন্ত্র স্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোতে সরকার থেকে বারবার সময় নেওয়ায় রায় বাস্তবায়নে সংশয় দেখা দিয়েছে। এদিকে দেশের প্রতিটি জেলায় ফুড কোর্ট (খাদ্য আদালত) গঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্যাতন, ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য উদ্ধারকারী সরঞ্জাম সংগ্রহ, যানবাহনে হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বন্ধ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চে দেওয়া ভাষণের স্থান ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ স্থান সংরক্ষণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির আশপাশ এবং মহাস্থানগড়, লালবাগ কেল্লা সংরক্ষণসহ বিভিন্ন রায় বাস্তবায়নে চলছে ধীরগতি।
চার নদী :২০০৯ সালের ২৫ জুন হাইকোর্ট চারটি নদী রক্ষায় ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেন। রায়ে নদীতীরবর্তী স্থায়ী ও অস্থায়ী সব স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদীর সঠিক গতিপথ নির্ণয় করতে সিএস রেকর্ড অনুসারে নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এ রায় বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছিল। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ওই রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে। অথচ সেই রায় আজও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
ট্যানারি শিল্প : ২০০৯ সালের ২৩ জুন হাইকোর্ট হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারে সরিয়ে নিতে ট্যানারি মালিক ও সরকারপক্ষকে সময় বেঁধে দেন। রায়ে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজধানীর হাজারীবাগের সব চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠান সাভার এলাকার নির্ধারিত জায়গায় স্থানান্তর করতে বলা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায় বাস্তবায়িত না হলে ট্যানারি শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হবে। এর পরও সরকারের পক্ষ থেকে আবার সময় প্রার্থনা করা হলে বর্তমানে ট্যানারি শিল্পগুলো সেখানেই তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
খাদ্য আদালত : ২০০৯ সালের ১ জুন হাইকোর্টের এক রায়ে খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে এক বছরের মধ্যে প্রতিটি জেলায় ‘খাদ্য আদালত’ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় প্রয়োজনীয় একজন করে ‘খাদ্য বিশ্লেষক’ ও ‘খাদ্য পরিদর্শক’ নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকারের পদক্ষেপগুলো হলফনামা আকারে ২০১০ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়। হাইকোর্টের সেই আদেশ আজও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
পাইরেসি : ২০১০ সালের ১৭ আগস্ট হাইকোর্ট এক রায়ে সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, পরিচালক, প্রযোজক ও চলচ্চিত্রের কলাকুশলীদের শিল্পকর্মের অডিও ও ভিডিও পাইরেসি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দেন। রায় বাস্তবায়ন বিষয়ে আদালত তিন মাস পরপর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ নির্ধারিত সময়ের দু’বছর পার হলেও একটি প্রতিবেদনও আদালতে জমা দেওয়া হয়নি। উচ্চ আদালতের রায় উপেক্ষিত রয়েছে বলে জানান রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার মেহেদী হাসান চৌধুরী। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্ট এক রায়ে বাজারে নোট ও গাইড বই বিক্রি অবৈধ ঘোষণা করেন। আজও ওই রায় বাস্তবায়িত হয়নি।

News From- Samokal

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: